০৫:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

জন্মভূমিকে আলো ছড়িয়ে গেলেন প্রবাসী নায়ক মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী

  • প্রকাশের সময় : ০৪:১৬:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
  • 60

মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

বিদেশে প্রবাসী জীবন কাটালেও নিজের জন্মভূমি ও মানুষের জন্য নিবেদিত জীবনযাপন; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিকতার আলোর বাতি জ্বালাচ্ছেন ব্রাহ্মণপাড়ায়।

বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদে শিক্ষা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া মানুষদের গল্প প্রায়ই নজর কেড়ে নেয় না। অথচ একই সময়ে, সমাজের নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন এমন মানুষ, যাদের উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে সাহায্য করা, প্রচার বা রাজনৈতিক সুবিধা নয়। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামে জন্ম নেওয়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী এই ধরনের একজন মানুষ।

উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর জীবিকা নির্বাহের জন্য দেশ ছাড়তে হয়েছে তাকে। বিদেশে নিউইয়র্কের ট্যাক্সিক্যাব চালানো, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও ছোটখাট ব্যবসায় কাজ—সবকিছুর উদ্দেশ্য ছিল একটাই: কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে জনহিতকর কাজে লাগানো।

১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর মোশাররফ হোসেন খানের জন্ম হয় প্রবন্দর রাজ্জাক খান চৌধুরী ও মোসাম্মৎ আশেদা খাতুন চৌধুরীর ঘরে। ছোটবেলা থেকেই দুঃসাহসিক ও শিক্ষানুরাগী মানসিকতা তাকে ভিন্ন করে তুলেছিল। ১৯৭৪ সালে বাবার প্রয়াণের পর ছয় ভাইবোনের দায়িত্ব একার কাঁধে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজের এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী শুধু নিজের জন্য নয়, গ্রামের শিশু ও যুবকদের জন্য একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ১৯৮৯: ধান্যদৌল গ্রামে আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।১৯৯৮: রাজৎগাড়া উপজেলা সদরে মোশাররফ হোসেন খান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, যেখানে অনার্স সহ ১০টি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী পড়ছে। সাথেসাথে মহিলা শিক্ষার জন্য: আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী। ২০০২: মম রোমন কিন্ডারগার্টেন, প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী। এছাড়া মাদ্রাসা, পাঠাগার ও লাইব্রেরি স্থাপন, যা শিশুদের চরিত্র ও নৈতিক উন্নয়নে সহায়ক।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল কেবল শিশুদের শিক্ষা এবং এলাকার মানবিক উন্নয়ন। মোশাররফ বলেন, “আমার কোনো অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্য ছিল না। মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া।”

স্বাস্থ্য ও মানবিকতায় অবদান-শুধু শিক্ষা নয়, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ২০১০ সালে কুমিল্লায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণে ১ বিঘা জমি দান করেছেন। এছাড়া গরিবদের সহায়তা, মসজিদ নির্মাণে অবদান—সবই তার স্বভাবের অংশ। তিনি বলেছেন, “মানবিকতা ছাড়া জীবনের কোন মান নেই। আমি চেষ্টা করি আমার অর্জিত অর্থ ও শ্রম মানুষের জন্য ব্যয় করতে।”
প্রবাসী জীবনে অর্জিত সম্মাননা ২ নভেম্বর ২০২৫, নিউইয়র্কের “ট্যারেস অন দ্য পার্ক”-এ বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক.’র সুবর্ণজয়ন্তীতে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীকে শিক্ষা ও মানবিক উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। তিনি বলেন, “এই সম্মাননা শুধুই আমার নয়; এটি দেশের অসংখ্য শিক্ষানুরাগী মানুষের প্রাপ্য।”

মোশাররফ হোসেন খানের জীবন প্রমাণ করে—উন্নয়ন শুরু হয় একটি শিশুর জীবনে, একটি বইয়ের পাঠে, একটি শ্রেণিকক্ষে, একটি হাসপাতাল থেকে। তার কর্মকাণ্ড প্রান্তিক জনপদে শিক্ষার মান ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।

এক অনন্য নীরব বিপ্লবী -মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী প্রমাণ করেছেন, উন্নয়ন শুধু শহরে হয় না; এটি গ্রামে শুরু হয়। শিক্ষার প্রতি তার দায়িত্ববোধ, মানবিকতার প্রতি তার নিবেদন ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে সাধারণ মানুষের ভিড় থেকে আলাদা করে। তিনি একমাত্র ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য কাজ করেননি; বরং প্রতিটি অর্জনকে করেছেন জনকল্যাণে ব্যয় করার জন্য।

তিনি সেই “আলোর ফেরিওয়ালা”, যিনি নিজের জীবনের প্রতিটি অর্জনকে মানুষের কল্যাণে পরিণত করেছেন। ব্রাহ্মণপাড়ার প্রান্তিক জনপদ আজ তার শিক্ষা ও মানবিকতা থেকে আলোকিত। তার জীবন ও কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, মানবিক নেতৃত্ব কখনো বড় শব্দ বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নিরন্তর, নিভৃতে, সমাজের জন্য দায়বদ্ধভাবে কাজ করে।

জনপ্রিয়

ক্ষতিগ্রস্তদের সান্ত্বনা দেয়ার পাশাপাশি নগদ অর্থ শুকনো খাবার ও কম্বল দেয়া হয়েছে

জন্মভূমিকে আলো ছড়িয়ে গেলেন প্রবাসী নায়ক মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী

প্রকাশের সময় : ০৪:১৬:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫

মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

বিদেশে প্রবাসী জীবন কাটালেও নিজের জন্মভূমি ও মানুষের জন্য নিবেদিত জীবনযাপন; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিকতার আলোর বাতি জ্বালাচ্ছেন ব্রাহ্মণপাড়ায়।

বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদে শিক্ষা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া মানুষদের গল্প প্রায়ই নজর কেড়ে নেয় না। অথচ একই সময়ে, সমাজের নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন এমন মানুষ, যাদের উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে সাহায্য করা, প্রচার বা রাজনৈতিক সুবিধা নয়। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামে জন্ম নেওয়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী এই ধরনের একজন মানুষ।

উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর জীবিকা নির্বাহের জন্য দেশ ছাড়তে হয়েছে তাকে। বিদেশে নিউইয়র্কের ট্যাক্সিক্যাব চালানো, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও ছোটখাট ব্যবসায় কাজ—সবকিছুর উদ্দেশ্য ছিল একটাই: কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে জনহিতকর কাজে লাগানো।

১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর মোশাররফ হোসেন খানের জন্ম হয় প্রবন্দর রাজ্জাক খান চৌধুরী ও মোসাম্মৎ আশেদা খাতুন চৌধুরীর ঘরে। ছোটবেলা থেকেই দুঃসাহসিক ও শিক্ষানুরাগী মানসিকতা তাকে ভিন্ন করে তুলেছিল। ১৯৭৪ সালে বাবার প্রয়াণের পর ছয় ভাইবোনের দায়িত্ব একার কাঁধে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজের এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী শুধু নিজের জন্য নয়, গ্রামের শিশু ও যুবকদের জন্য একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ১৯৮৯: ধান্যদৌল গ্রামে আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।১৯৯৮: রাজৎগাড়া উপজেলা সদরে মোশাররফ হোসেন খান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, যেখানে অনার্স সহ ১০টি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী পড়ছে। সাথেসাথে মহিলা শিক্ষার জন্য: আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী। ২০০২: মম রোমন কিন্ডারগার্টেন, প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী। এছাড়া মাদ্রাসা, পাঠাগার ও লাইব্রেরি স্থাপন, যা শিশুদের চরিত্র ও নৈতিক উন্নয়নে সহায়ক।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল কেবল শিশুদের শিক্ষা এবং এলাকার মানবিক উন্নয়ন। মোশাররফ বলেন, “আমার কোনো অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্য ছিল না। মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া।”

স্বাস্থ্য ও মানবিকতায় অবদান-শুধু শিক্ষা নয়, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ২০১০ সালে কুমিল্লায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণে ১ বিঘা জমি দান করেছেন। এছাড়া গরিবদের সহায়তা, মসজিদ নির্মাণে অবদান—সবই তার স্বভাবের অংশ। তিনি বলেছেন, “মানবিকতা ছাড়া জীবনের কোন মান নেই। আমি চেষ্টা করি আমার অর্জিত অর্থ ও শ্রম মানুষের জন্য ব্যয় করতে।”
প্রবাসী জীবনে অর্জিত সম্মাননা ২ নভেম্বর ২০২৫, নিউইয়র্কের “ট্যারেস অন দ্য পার্ক”-এ বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক.’র সুবর্ণজয়ন্তীতে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীকে শিক্ষা ও মানবিক উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। তিনি বলেন, “এই সম্মাননা শুধুই আমার নয়; এটি দেশের অসংখ্য শিক্ষানুরাগী মানুষের প্রাপ্য।”

মোশাররফ হোসেন খানের জীবন প্রমাণ করে—উন্নয়ন শুরু হয় একটি শিশুর জীবনে, একটি বইয়ের পাঠে, একটি শ্রেণিকক্ষে, একটি হাসপাতাল থেকে। তার কর্মকাণ্ড প্রান্তিক জনপদে শিক্ষার মান ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।

এক অনন্য নীরব বিপ্লবী -মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী প্রমাণ করেছেন, উন্নয়ন শুধু শহরে হয় না; এটি গ্রামে শুরু হয়। শিক্ষার প্রতি তার দায়িত্ববোধ, মানবিকতার প্রতি তার নিবেদন ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে সাধারণ মানুষের ভিড় থেকে আলাদা করে। তিনি একমাত্র ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য কাজ করেননি; বরং প্রতিটি অর্জনকে করেছেন জনকল্যাণে ব্যয় করার জন্য।

তিনি সেই “আলোর ফেরিওয়ালা”, যিনি নিজের জীবনের প্রতিটি অর্জনকে মানুষের কল্যাণে পরিণত করেছেন। ব্রাহ্মণপাড়ার প্রান্তিক জনপদ আজ তার শিক্ষা ও মানবিকতা থেকে আলোকিত। তার জীবন ও কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, মানবিক নেতৃত্ব কখনো বড় শব্দ বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নিরন্তর, নিভৃতে, সমাজের জন্য দায়বদ্ধভাবে কাজ করে।